• সোমবার ০৪ মার্চ ২০২৪ ||

  • ফাল্গুন ২০ ১৪৩০

  • || ২২ শা'বান ১৪৪৫

আজকের খুলনা

সাফাদির সঙ্গে বৈঠক

ইসরাইলের কাঁধে ভর দিয়ে কী গেম খেলতে চায় নুর!

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ৬ জুলাই ২০২৩  

গণ অধিকার পরিষদের সদস্যসচিব নুরুল হক নুরের সঙ্গে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের বৈঠক নিয়ে আবারও সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনীতি। পাশাপাশি কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে (কেএনএফ) তার অস্ত্র সরবরাহের স্বীকারোক্তিমূলক একটি হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনও সামাজিকমাধ্যমে ফাঁস হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন নুর।

মঙ্গলবার (৪ জুলাই) ‘কে এই মেন্দি এন সাফাদি’ শিরোনামে একটি খবর ছাপে দৈনিক প্রথম আলো। পরে দৈনিক যুগান্তরের অনলাইনে ‘কে এই মেন্দি এন সাফাদি, কী তার মিশন!’ শিরোনামে একই বিষয়ে আরেকটি খবর প্রকাশ করা হয়েছে।

এরআগে গেল ৩ জানুয়ারি ‘নুর কি শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের দ্বারস্থ?’ শিরোনামে খবর ছেপেছিল সময় সংবাদ। তখন এমন খবরকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন নুর।

বুধবার (৫ জুলাই) এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনালাপেও সাফাদির সঙ্গে বৈঠকের খবর অস্বীকার করেন নুর।

নুরের সঙ্গে মেন্দি সাফাদির বৈঠকের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিকমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ফেসবুকে শহিদুল ইসলাম সেলিম নামের এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘নুররা ক্ষমতা না পেয়েই যা করছে, ক্ষমতা পেলে নিজের স্বার্থে দেশ বিক্রি করতেও দ্বিধা করবে না।’

প্রথম আলোর খবরে যা আছে
 
প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন শেখ সাবিহা আলম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে মেন্দি এন সাফাদি বলেছেন, তার সঙ্গে নুরের সাক্ষাৎ হয়েছিল। গত ২৬ জুন মেন্দি এন সাফাদি মুঠোফোনে খুদে বার্তা দিয়ে এসব কথা জানিয়েছেন।’
 
প্রথম আলো জানায়, ‘তার (সাফাদি) মুঠোফোন নম্বরটি প্রথম আলো সাফাদি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাসি, রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস নামে ফেসবুক পেজ থেকে সংগ্রহ করেছে। প্রতিষ্ঠানের বোর্ড মেম্বার হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলের বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীন ইসরায়েলি করপোরেশনস অথরিটিতে নিবন্ধিত।’
 
আওয়ামী লীগের ওয়েব টিমের সমন্বয়ক তন্ময় আহমেদ বলেন, এত কিছুর পরেও যদি কেউ মিথ্যাচার করে বেড়ায়, তাহলে বাংলাদেশের তরুণদের নিয়ে তার রাজনীতি করার কোনো ভিত্তি নেই। তিনি সাফাদির সঙ্গে দেখা করলে সেটি কোনো ইস্যু না। কিন্তু সেখানে গিয়ে কী চক্রান্ত করেছেন, বাংলাদেশের সরকার কীভাবে ফেলে দেবে, সেগুলোই নিয়েই তিনি সাফাদির সঙ্গে কাজ করেছেন।
 
তিনি আরও বলেন, সাফাদির সঙ্গে তার দেখা করার সোর্স ছিল শিপন কুমার বসু। এটি একবারে নিশ্চিত। এত প্রমাণ ও সূত্র থাকার পরেও কেউ যদি তা অস্বীকার করে, তাহলে তাকে কখনোই বাংলাদেশের তরুণরা গ্রহণ করবে না। তার কোনো নৈতিকতা নেই। দলের নামে টাকা উঠিয়ে তিনি আত্মসাৎ করেন। এতটুকু লোভ যদি সামলাতে না পারে, তাহলে তিনি কীভাবে নেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
 
সাফাদি সেন্টারের ফেসবুক পেজে শিপনের সঙ্গে মেন্দি এন সাফাদির অনেক ছবি রয়েছে। তিনি এক ভিডিও বার্তায় শিপনকে তার মুখপাত্র হিসেবে ঘোষণাও দিয়েছিলেন।

এ নিয়ে জানতে চাইলে নুর সময় সংবাদকে বলেন,আমি অনেকবার বলেছি, সাফাদির সঙ্গে আমার কোনো বৈঠক হয়নি। সরকারবিরোধী রাজনীতি করছি, সেখানে আমাদের ফাঁসানোর জন্য সরকারের লোকের বিভিন্ন স্বীকারোক্তি দেবে। আমি স্পষ্ট বলছি, কারও কাছে এমন কোনো বৈঠকের নথি থাকলে, যাতে তারা প্রকাশ করে।

হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথোন ফাঁস
 
এদিকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির সঙ্গে ফাঁস হওয়া নূরের হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনে কয়েকটি স্ক্রিনশট ফাঁস হয়েছে। তাতে সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নুর বলেন, ‘ভাই, আপনি চিন্তা করবেন না, সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সরকার আর থাকছে না। ভাই, এক লাখ কার্তুজের গুলি পাঠিয়েছি।’
 
তবে যে ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন নুর, হোয়াটসঅ্যাপের ‘ডিসঅ্যাপিয়ারিং ম্যাসেজেস’ চালু থাকার কারণে তার বক্তব্য উধাও হয়ে গেছ। আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথেন দৈনিক যুগান্তরের ‘শূন্যরেখা ও তোতার দ্বীপে জঙ্গি ঘাঁটি’ শিরোনামের একটি খবর শেয়ার করে নুরকে বলতে দেখা গেছে, ‘যুগান্তরের এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন, সে বড্ড বাড়াবাড়ি করছে’।
 
এ ছাড়াও একটি হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনে ‘বান্দরবানের পাহাড়ে নতুন আতঙ্ক কুকি-চিনের পুঁতে রাখা বোমা!’ শিরোনামের একটি নিউজ শেয়ার দিয়ে নুরকে বলতে দেখা গেছে, ‘ভাই, আমি কি অস্ত্র পাঠিয়েছি, দেখেন আপনি...। ভাই ঠিক আছে? ভাই দেখেছেন?’ অপর পাশ থেকে তখন জবাব এসেছে, ‘দেখছি’।
 
রাঙামাটির সাজেকের বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বান্দরবানের উপকণ্ঠ থেকে চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো অঞ্চল হয়ে রুমা রোয়াংছড়ি, থানছি, লামা ও আলীকদম— এই ৯টি উপজেলা নিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত একটি পৃথক রাজ্য সৃষ্টি করাই কেএনএফের উদ্দেশ্য। তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থানের পেছনে রয়েছে সেখানকার বম সম্প্রদায়।
 
আর সেই বম সম্প্রদায়ের নেতা নাথান বম হলেন এই সংগঠনের প্রধান। নাথান বমই এনজিও’র নামে বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করে আসছেন। এছাড়া জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং আশ্রয় দেয়ার জন্য তাদের কাছ থেকে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ।
 
হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন নিয়ে জানতে চাইলে নুরুল হক নুর বলেন, 
এমন কিছু আমি দেখিনি। কুকি চিন একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তারা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। আমরা পত্রপত্রিকায় দেখে এসেছি, তারা আমাদের সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত হানছে। হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে আপনাদের (সাংবাদিক) এতটুকু বলি, আপনারা কোনো তথ্য প্রকাশ করলে তার সত্যতা নিশ্চিত হয়ে নিয়েন।
 
তিনি বলেন, ‘স্ক্রিনশট তো বানানো যায়। ভিডিও-ছবি সম্পাদনা করে প্রকাশ করা যায়। কাজেই আপনারা সত্যতা নিশ্চিত হয়ে নিয়েন।’
 
‘নুরের আচরণ বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে যায়’
 
বৈঠকের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান একটি গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লাভের পর থেকে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে এসেছে। অন্যদিকে একজন ‘গণতন্ত্রকামী’ নেতা হিসেবে নূরের এমন আচরণ বাংলাদেশের ৯০ ভাগ জনগণের মতের বিরুদ্ধে যায়। এই ৯০ শতাংশ মানুষের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে কেউ তো গণতন্ত্রের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
 
তিনি বলেন, ‘প্রথমত এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের ওপর আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। এ বিষয়ে যেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, তারা সেটাই করবে বলে আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। নির্বাচনের আগে পরিবেশ উত্তপ্ত অবস্থায় থাকায় কিছু ব্যক্তি এটাকে ব্যবহারের চেষ্টা করছেন। আমরাও এটা বুঝতে পারি। বাংলাদেশের জনগণ, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। তারাই এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’
 
বিশ্বাসঘাতক মেন্দি এন সাফাদি
 
ইসরাইলি এই গোয়েন্দার পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত বলেন, তার নাম মেন্দি সাফাদি নয়। তার আসল নাম মুনজের সাফাদি। তিনি গুলেন হায়েস্ত এলাকার একজন সিরিয়ান। এই এলাকাটি ১৯৬৫ সালে ইসরায়েল দখল করে নিয়েছে। এই ব্যক্তি মোসাদকে সহায়তা করে, এ কারণে মা-বাবা, ভাই-বোন সাফাদিকে ত্যাগ করে ও পরিবার থেকে বিতাড়িত করে। এরপর সে গুলেন হায়েস্ত ছেড়ে তেল আবিবে যায় এবং সেখানে শিক্ষাজীবন শেষে মোসাদে যোগ দেয়।
 
মেন্দি এন সাফাদিকে একজন বিশ্বাসঘাতক উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান বলেন,এমন চরিত্রের (বিশ্বাসঘাতক) একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করে কেউ যদি মনে করে সে বড় রাজনীতিবিদ হয়ে যাবে, এটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। যে দেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ আমাদের পাশে আছে, তখন কোন ব্যক্তি কোথায় কার সঙ্গে মিটিং করল তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না।
 
ফিলিস্তিনের এই প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সদ্য স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লাভ করা বাংলাদেশে প্রথম যে দেশগুলো স্বীকৃতি জানিয়ে চিঠি লেখে, তার মধ্যে একটি ছিল ইসরাইল। কিন্তু বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার ও শেখ মুজিবুর রহমান সেই স্বীকৃতি গ্রহণ করেননি। বরং সেই চিঠি ফেরত পাঠিয়ে দেন। দুই দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যকার এই বন্ধুত্ব ভবিষ্যতেও থাকবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমি।’
 
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাব তাদের সমর্থনের জন্য। আমরা কখনোই ভুলে যাব না। আমাদের সন্তানরাও মনে রাখবে। এই দেশের মানুষ, দেশের সরকার কীভাবে আমাদের পাশে ছিল। সব আন্তর্জাতিক ফোরামে যেখানেই সমর্থন দরকার হয়েছে, বাংলাদেশ সবসময় ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিয়েছে। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ যখনই এসেছে, বাংলাদেশ সর্বপ্রথম আমাদের পক্ষে তার ভোটটি দিয়েছে। এ সবই ফিলিস্তিনের ইতিহাসে লেখা থাকবে।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা