• বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

  • || ০৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

আজকের খুলনা

পদ্মা সেতু: কৃষি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে দক্ষিণাঞ্চল

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২২  

খুলনার দাকোপের কৃষক আরাফাত হোসেন চলতি বছর ৯ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে দাম ভালো না পাওয়ায় ট্রাকে করে ঢাকায় নিয়ে যান। কিন্তু এই কষ্ট করে যে লাভের আশা করেছিলেন, সেটি হয়নি। ফেরি পারাপারে প্রায় ১৮ ঘণ্টা সময় লেগে যায় রাজধানীতে পৌঁছাতে। ট্রাক ভাড়া দিতে হয় দেড়গুণ। পদ্মা সেতু চালু হলে আরাফাতের এই পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই বেঁচে যাবে। চার ঘণ্টায় ঢাকায় এসে পণ্য বিক্রি করে আবার ফিরে যেতে পারবেন। নিজেরা পণ্য নিয়ে আসতে পারলে ফরিয়ারা ঘাটের সমস্যার কথা বলে একজোট হয়ে কৃষকদের কম দাম দেয়ার যে কথা বলে, সেই সমস্যার সমাধানের আশা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা কার্যালয়ের উপপরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘খুলনায় এ বছর ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করা হয়েছিল। উৎপাদিত তরমুজের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা।
‘এসব তরমুজের ৭০ শতাংশ রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়। খুলনা থেকে ট্রাকে করে পদ্মা পাড়ি দিয়ে রাজধানীতে নিতে হয় তরমুজ। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হয়। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর তরমুজের বিপণনও সহজ হবে, কৃষকরাও পর্যাপ্ত দাম পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘এ বছর বিপণন ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় অনেক কৃষক তরমুজের দাম পাননি। আগামীতে আর এমনটি হবে না আশা করি।’
যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের আগে উত্তরের চাষিদের কৃষিপণ্য নিয়ে যে হাহাকার ছিল, সেটি দূর হয়েছে অনেকটাই। বিপণন সহজতর হওয়ায় উত্তরের জনপদে কৃষি বিপ্লব হয়ে গেছে বলা চলে। উত্তরে এখন আপেল, স্কোয়াশ, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ক্যাপসিকাম এমনকি নাসার মহাকাশচারীদের খাবার কিনোয়াও চাষ হচ্ছে সেখানে। এই সেতু হওয়ার আগে উত্তরের চাষিদের যেসব সমস্যা ছিল, এখন তা দেখা যায় খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের চাষিদের। সেখানে উৎপাদিত পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না, ফলে কৃষকরা উৎসাহ পান না কৃষিতে। এই সমস্যার সমাধান হলে উত্তরের মতো দক্ষিণাঞ্চলও কৃষি হাব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনাঞ্চলের ব্যবসায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এর মধ্যে অন্যতম কৃষিতে পরিবর্তন। এ অঞ্চলের কৃষকরা প্রচুর ফসল উৎপাদন করতে পারলেও পর্যাপ্ত দাম পান না। ‘এর মূল কারণ হলো, রাজধানীর সঙ্গে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়া। তাই পদ্মা সেতু চালু হলে যাতায়াতের আর সমস্যা থাকবে না। এতে কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা সহজ হবে, এর সঙ্গে জড়িতরাও লাভবান হবেন।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন কৃষিপণ্য রাজধানীতে নেয়া হয়।
অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘কেবল ডুমুরিয়া উপজেলাতেই বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। এসব পণ্যের একটি বড় অংশ রাজধানীতে নেয়া হয়। পদ্মা সেতু চালু হলে কৃষিপণ্য বিপণন সহজ হবে, কৃষকরাও উপকৃত হবেন।’
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান শেখ সৈয়দ আলী জানান, খুলনা থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার পাট রপ্তানি করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাট কিনে খুলনায় নিয়ে আসা হয়। এই পাট মোংলা বন্দর হয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পাট কিনে আনার সময় পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয়। আবার খুলনার পাটকলে উৎপাদিত পাটজাত পণ্য রাজধানীতে নেয়া হয়। এতে যে সময়ের অপচয় হয়, তার আর্থিক মূল্য অনেক বেশি- বলছিলেন সৈয়দ আলী। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে পাটের অবস্থান ভালো করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর এ খাত আরও এগিয়ে যাবে।’ খুলনা অঞ্চলের মাছ রাজধানীবাসীর পাশাপাশি রসনা বিলাসে ব্যয় হয় দেশের বাইরেও মানুষের। এই চাষে জড়িতরাও আছেন সেতু চালুর অপেক্ষায়। মাছ পরিবহনে সময় একটি বড় বিষয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে ফেরিঘাটে বেশি সময় ব্যয় হলে বরফ গলে গিয়ে যে সংকট দেখা দেয়, সেটি দূর হলেই চাষি ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি অনেকটাই দূর হবে।
খুলনা চিংড়ি বণিক সমিতির সভাপতি শেখ আবু জাফর বলেন, ‘রাজধানীতে চিংড়ি পাঠাতে পদ্মায় ফেরির যানজটের কারণে অনেক সময় দুই দিনও দেরি হয়। তখন চিংড়িতে দেয়া বরফ ফুরিয়ে যায়। এতে চিংড়িতে ব্যাকটেরিয়া জন্মে। কিন্তু সেতু চালু হলে এই সমস্যা আর থাকবে না। সকালে পাঠানো চিংড়ি বিকেলে রাজধানীতে বিক্রি করতে পারব।’
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এস হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘প্রতি বছর দেশ থেকে ৩০ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি হয়। এসব চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানা খুলনা ও চট্টগ্রামে। অনেক সময়ে খুলনা থেকে চট্টগ্রামে চিংড়ি আনা-নেয়া করতে হয়। তখন ফেরিঘাটে অনেক কালক্ষেপণ হয়ে পণ্য নষ্ট হয়ে যায়।’
মৎস্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য বলছে, প্রতিদিন খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকে রাজধানীতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ১৪৫ থেকে ১৬০ টন মাছ নেয়া হয়। এসব মাছের বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
খুলনার রূপসা পাইকারি বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আল আমিন বলেন, ‘খুলনাঞ্চলেই প্রচুর মাছ উৎপাদিত হয়। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরেও আহরণ করা মাছ খুলনায় আসে। এখান থেকে মাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ বরফ দিয়ে ট্রাকে করে ঢাকা নেয়া হয়। এক দিনের মধ্যে মাছগুলো ঢাকা পৌঁছাতে না পারলে ভালো বাজারদর পাওয়া যায় না।’
তিনি বলেন, ‘অনেক সময়ে ফেরিতে গাড়ি ওঠাতে ৩ থেকে ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ওই দিন ঢাকার বাজারে মাছ বিক্রি করতে পারি না। পরের দিন বিক্রি করতে হয়। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। সেতু চালু হলে এ সমস্যা থাকবে না।’
মৎস্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. তোফাজউদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘মাছ জরুরি খাদ্যপণ্য। নির্দিষ্ট সময় পর এটি নষ্ট হয়ে যায়। পদ্মা সেতু চালু হলে মাছের বিপণন ও বাজারজাতকরণ সহজ হবে। এতে জেলে, মৎস্য চাষি ও ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হবেন।’

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা