• মঙ্গলবার   ০৪ অক্টোবর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১৯ ১৪২৯

  • || ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

আজকের খুলনা

এখনো কৃষিকাজ করেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া নীলমণি

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ১১ মে ২০২২  

সাঁওতাল মেয়ে নীলমণি কিসকু। পড়েন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতি বিভাগে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। এসেই ছোটবেলার মতো মা-বাবার সঙ্গে মাঠে নেমে পড়েছেন। শুধু নিজের জমিতেই নয়, এভাবে অন্যের জমিতেও কাজ করেন নীলমণি। যা আয় হয় তা নিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ান। 

সাঁওতাল মেয়েদের রক্তে মিশে আছে ধান বোনা, ধান কাটা, নিড়ানোসহ নানা কৃষিকাজ। পরিবারের অভাব-অনটন মেটাতে শিশুকালেই এসব কাজ শিখে নেন তাঁরা। নীলমণি কিসকুও রপ্ত করেছেন ছোটবেলায়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও ছোটবেলার সেসব কাজ আজও ছাড়েননি। ধান বোনা ও কাটার মৌসুমের সময় বাড়িতে থাকলে পরের জমিতে এসব কাজ করে আয় করেন তিনি। পরিবারের অভাব–অনটনে, নিজের লেখাপড়া ও হাতখরচে লাগে তাঁর আয় করা টাকা। 

সাঁওতাল মেয়ে নীলমণি কিসকু। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্রী। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। ৭ মে মা-বাবার সঙ্গে বোরো ধান কাটার সময় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। নীলমণিদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জুগিডাইং গ্রামে। 

নীলমণি কিসকুর পরিবারের ১৩ কাঠা জমি। সে জমিতে এবার ধান চাষ করেছিলেন নীলমণির বাবা তালা কিসকু। এখন ধান পেকেছে। মা-বাবার সঙ্গে জমির ধান কাটছিলেন নীলমণি। এই ধান দিয়ে তাঁদের সারা বছরের খোরাকি চলে না। অন্যের জমিতে খেতমজুরি করেই চলে তাঁদের সংসার। 

নীলমণি বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি বলে মাঠের কাজ করব না, সাঁওতাল মেয়ের এসব অহমিকা মানায় না। জীবনের প্রয়োজনেই আমাদের এসব করতে হয়। কষ্ট করেই লেখাপড়া করতে হয়।’

নীলমণির গল্প
২০১৮ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন নীলমণি। সেবারও জুগিডাইং গ্রামে তাঁর সন্ধানে গিয়ে তাঁকে ধান খেতেই পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর ধান বোনার ছবিসহ সংবাদপত্রে শিরোনাম ছিল, ‘নীলমণি কিসকুর এখন কী হবে?’ ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভাব-অনটনের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেছেন নীলমণি। একটা চাকরি জোটানোর আশায় ভর্তি হয়েছেন কম্পিউটার শিক্ষার ছয় মাস মেয়াদি কোর্সে। 

প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর নীলমণির স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসেন অনেকে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান নীলমণি। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নপূরণের গল্পও ছাপা হয় সংবাদপত্রের। সে খবর পড়ে তাঁর পড়াশোনার সহায়তায় এগিয়ে আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। 

নীলমণি কিসকু বলছিলেন, ‘সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার সুবাদে আমার যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হয়, তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয় নওগাঁর নিয়ামতপুরের মেয়ে ঝিরিনা মুন্ডা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের সাঁওতাল মেয়ে ছায়া টুডুর। আমাদের মতো মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’

বাবার গর্ব
মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, এ নিয়ে তালা কিসকুর আনন্দের শেষ নেই। তিনি জানান, নীলমণি কিসকু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও বাড়িতে থাকার সময় সব কাজই করেন। ধান রোয়া ও কাটার কাজ করেন। 

নীলমণি স্কুলে পড়ার সময় ভালো ফুটবলও খেলতেন। তালা কিসকুর আরও এক মেয়ে সুরধ্বনি কিসকুও ভালো ফুটবলার। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) তিনি উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বিকেএসপির হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ দলের প্রতিযোগিতায় দেশ-বিদেশে খেলার সুযোগ পেয়েছেন।

অভাব–অনটনের সংসারেও এই দুই মেয়ের অর্জন নিয়ে তালা কিসকুর অনেক গর্ব। গ্রামের লোকজন ও আত্মীয়স্বজনও তাঁর দুই মেয়ের অনেক সুনাম করে। তাঁকে সম্মান করে। দুই মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন তিনি। নীলমণি একদিন অনেক বড় হবেন। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবেন। নিজের সম্প্রদায়ের জন্যও কাজ করবেন।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা