• বৃহস্পতিবার   ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ||

  • ফাল্গুন ১৫ ১৪২৬

  • || ০৩ রজব ১৪৪১

আজকের খুলনা
সর্বশেষ:
চট্টগ্রামে জাল ব্যাংক স্লিপ দিয়ে পাসপোর্ট আবেদন, আটক ১ টেকনাফে মালয়েশিয়াগামী ৬ রোহিঙ্গা আটক সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮৬ রানে হারলো বংলাদেশের নারীরা খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন আবারও খারিজ কুষ্টিয়ায় ট্রাকচাপায় বৃদ্ধা নিহত
৯০

সুন্দরবন দিবস আজ : লবনাক্ততায় বদলে যাচ্ছে জীববৈচিত্র

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ক্রমাগত বদলাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, পলি পড়া ও দূষণের কারণে ঘটছে এ পরিবর্তন। এ ছাড়া বনসংলগ্ন এলাকায় শিল্প কারখানা স্থাপন, বনের মধ্য দিয়ে ভারী নৌযান চলাচল, নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটনসহ মানুষের বিভিন্ন আগ্রাসনকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ বা মোকাবিলায় তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই বন বিভাগের। এমনই অবস্থায় আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হবে সুন্দরবন দিবস। ২০০১ সাল থেকে সুন্দরবন সংলগ্ন জেলাগুলোতে বেসরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছে দিনটি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের গবেষণায় দেখা গেছে, বনের মধ্যে পশুর নদীতে ২০১০ সালে লবণাক্ততার সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৫ পিপিটি। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৬ পিপিটিতে। এ ছাড়া পশুর নদীর হাড়বাড়িয়া এলাকায় ২০১৩ সালে পলি পড়ার পরিমাণ ছিল ৯ সেন্টিমিটার। ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২-এ। নদীটির করমজল এলাকায় আগে ছিল ১৯ সেন্টিমিটার। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯-এ।
খুবি পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি পানি ও মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তন ও সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবহমান নদীগুলোর উৎসস্থল বা উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ক্রমাগত লবণাক্ততা ও বিস্তৃতি বাড়ছে। ফলে অপেক্ষাকৃত কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরী, পশুর, গোলপাতা ও খলিসা গাছের সংখ্যা কমছে। অন্যদিকে বেশি লবণসহিষ্ণু গরান, গেওয়া, কেওড়া, বাইন গাছসহ লতাগুল্ম বাড়ছে। এ অবস্থায় পরিবর্তন ঘটছে সুন্দরবনের পুরোনো জীববৈচিত্র্যে।

খুবি ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজমুস সাদাত গবেষণার তথ্য দিয়ে জানান, লবণাক্ততা বাড়ায় সুন্দরবনের কিছু গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণ ও পাচারকারীদের কারণে বনে বড় গাছ কমেছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকাকে সরকার 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' বা ইসিএ ঘোষণা করলেও গত ১০ বছরে সেখানে অর্ধশতাধিক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, এলপি গ্যাস প্ল্যান্ট, অয়েল রিফাইনারি, বিটুমিন এবং সি ফুড প্রসেসিং ফ্যাক্টরি। বনের খুব কাছেই বিশাল খাদ্যগুদাম নির্মাণ করেছে খাদ্য বিভাগ। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য পশুর নদীতে পড়ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মোংলা বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বনের মধ্য দিয়ে ১৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ পশুর নদীতে দেশি-বিদেশি জাহাজ চলছে। বনের মধ্যের নদী দিয়ে রায়মঙ্গল ও কয়রার আংটিহারা এলাকা দিয়ে জাহাজ যাওয়া-আসা করছে ভারতে। মোংলা বন্দরের পশুর নদীর চ্যানেলে প্রতি বছর আসছে গড়ে প্রায় সাড়ে চারশ' বিদেশি জাহাজ। এ ছাড়া নদীতে চলছে পণ্যবাহী কয়েক হাজার দেশি জাহাজ। এসব জাহাজের জ্বালানি তেল পড়ছে নদীতে।
খুবি পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১০ সালে পশুর নদীর প্রতি লিটার পানিতে তেলের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। আর এখন তা ৬৮। অথচ এর স্বাভাবিক মাত্রা ১০ মিলিগ্রাম।

খুবি অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের মধ্যে বয়ে চলা নদীর পানি ও মাটিতে দূষণ বেড়েছে। এ কারণে অনেক স্থানে আগের মতো চারা গজাচ্ছে না। এ ছাড়া নদীর পানিতে তেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ প্রাণী। সুন্দরবন একাডেমির উপদেষ্টা স্বপন গুহ জানান, জোয়ারের সময় বন থেকে অনেক গাছের ফল ভেসে লোকালয়ের দিকে আসছে। স্থানীয় লোকজন সেই ফলগুলো সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে গাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, সুন্দরবনের কটকা ও জামতলা এলাকায় সাগরের পানির তোড়ে উপড়ে পড়ছে অসংখ্য গাছ; গ্রাস হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। এ ছাড়া সৈকত থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার বনের ভেতর জমা হচ্ছে বালুর মোটা স্তর। বালুর কারণে মারা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বনের হিরণ পয়েন্ট এলাকায় গাছের ঘনত্ব কমে গেছে।
সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দীর্ঘদিন ধরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে একটি চক্র। ফলে বিভিন্ন মাছের পোনা, কাঁকড়া ও জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। সুন্দরবনে বাঘ ও কুমির হত্যা কমলেও হরিণ শিকারীরা এখনও সক্রিয়।
এ ছাড়া সুন্দরী, গেওয়া, গরানসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে তা বিক্রি করছে চোরাকারবারিরা। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজারেরও বেশি মানুষ সম্পৃক্ত রয়েছে এই কাজে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় চলছে গাছ পাচার। ফলে বনের অনেক এলাকাতেই কমে গেছে বড় গাছপালা।
প্রতি বছর সুন্দরবন ভ্রমণে যাচ্ছে প্রায় ২ লাখ পর্যটক। কিন্তু সচেতনতার অভাবে তারা চিপসের প্যাকেট, পলিথিন, পানি ও কোমল পানীয়ের বোতল ফেলছে বনের মাটি ও নদীতে। উচ্চ শব্দে গান বাজানো হচ্ছে পর্যটকবাহী নৌযানে, যা বন ও বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।
খুবি ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজমুস সাদাত বলেন, জাহাজের আলো, ইঞ্জিনের শব্দ ও হাইড্রোলিক হর্ন আতঙ্কিত করে তুলছে বন্যপ্রাণীদের। এর ফলে বন্যপ্রাণীর প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের মধ্যকার নদীতে রাসায়নিক সার, কয়লা ও ক্লিংকার বোঝাই জাহাজডুবি হচ্ছে মাঝেমধ্যে। এতে দূষণ ঘটছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বনের মধ্য দিয়ে চলাচল করা ভারী নৌযানের পাখার আঘাতে মারা পড়ছে ডলফিন। এ ছাড়া এসব এলাকায় জেলেদের মাছ ধরা জালে আটকা পড়ে শুশুক ও ইরাবতি ডলফিন মারা যাচ্ছে।

খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খান বলেন, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে কিছু পরিবর্তন ঘটছে। শিগগিরই 'সুন্দরবন সুরক্ষা' নামে একটি প্রকল্পের আওতায় বনের কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে কয়েকটি এলাকায় সুন্দরী গাছ কমলেও ঘন বনের পরিমাণ কমেনি; দাবি করে তিনি বলেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা হচ্ছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশিরুল আল মামুন বলেন, জনবল ও জলযান সংকটের মধ্যেও তারা বনের সম্পদ রক্ষায় সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা
আঞ্চলিক বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর