• সোমবার   ৩০ নভেম্বর ২০২০ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৭

  • || ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২

আজকের খুলনা

সবাইকে ম্যানেজ করে ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে ইটভাটা!

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০১৮  

কুষ্টিয়া জেলায় প্রায় দেড় শতাধিক ইটভাটার মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে মাত্র ২৬টি ইটভাটার।
এই তথ্য দিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার সিনিয়র কেমিস্ট মিজানুর রহমান। বাকি ইটভাটাগুলো ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে বলে জানান তিনি। তবে এসব অবৈধ ভাটা মালিকদের সাথে পরিবেশ অধিদপ্তরের কারো সাথে কোন অনৈতিক সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে তারপরও অবৈধ এসব ইটভাটাগুলো চলছে। আর এগুলো যত্রতত্র স্থাপনের ফলে সর্বনাশ ঘটছে আবাদি উর্বরা কৃষি জমির।
দেশসেরা উর্বরা কৃষি জমি ও উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের অঞ্চলখ্যাত কুষ্টিয়া জেলার মোট ১ লক্ষ ৬২হাজার হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ১ লক্ষ ১৭হাজার হেক্টরই কৃষি জমি হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে অতি উর্বরা তিন বা অধিক ফসলি কৃষি জমির পরিমাণ ৭৬ হাজার হেক্টর।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি বছর এসব কৃষি জমিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য জেলার প্রায় ২২ লক্ষ মানুষের বার্ষিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করেও উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য দেশের অন্যান্য জেলায় খাদ্য সরবরাহের যোগান দিচ্ছে।
খাদ্যশস্য উৎপাদনে এমন গৌরবময় অর্জন থাকলেও জেলায় ক্রমবর্ধমান কৃষি জমি ধ্বংসের শঙ্কার কথা জানাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে বেপরোয়া ইটভাটা মালিকদের কৃষি জমি আগ্রাসনকে এক আত্মঘাতী ঘটনা হিসেবে দেখছে কৃষি বিভাগ।
বিধি মতে, জেলায় ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে যথাযথ নিয়ম মেনে লাইসেন্সসহ আনুষঙ্গিক ছাড়পত্র নিতে হয়। জেলা প্রশাসন ইটভাটা স্থাপনে চুড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত: কৃষি বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ইতিবাচক ছাড়পত্র আছে কি না সে বিষয়টি দেখেন। কিন্তু কুষ্টিয়া জেলার ছয় উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি জমিতে গড়ে ওঠা ১৫২টি ইটভাটার মালিকদের কেউই উল্লেখিত নিয়ম মেনে ভাটা স্থাপন করেননি।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন চৌধুরী জানান, ভুমি জোনিং এ্যাক্ট-২০১০, কৃষি জমি সুরক্ষা আইন-২০১৫, পরিবেশ সুরক্ষা আইন-১৯৯৫সহ ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনে আইনগত নীতিমালা-২০১৩ সবই লংঘিত হয়েছে উপজেলার সকল ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে। সরেজমিনে অভিযানে গিয়ে তাদের কাছে ইটভাটা স্থাপনে লাইসেন্স বা ছাড়পত্র কিছুই পাওয়া যায়নি।
এখানের ইটভাটা মালিক সমিতির বশির উদ্দিন, আব্দুল হাকিম, মহিদুল, মনিরুল, খোকনসহ আরও একাধিক সদস্যের সাথে আলাপকালে তারা জানান, তারা ভ্যাট-ট্যাক্সসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরেই নিয়মিত টাকা দিচ্ছেন। তারা যদি অবৈধ হন তাহলে এসব টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে? আবার কেনইবা মাসে মাসে প্রশাসন অভিযানের নামে এসে জরিমানা আদায় ও ভাটা ভাংচুরসহ নানাভাবে তাদের আর্থিক ক্ষতি সাধন করছেন?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (খামার বাড়ি) কুষ্টিয়ার উপপরিচালক বিভুতি ভুষন সরকার বলেন, ‘কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে কৃষি ধ্বংসের একমাত্র এবং অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইটভাটা। বিগত এক দশকে জেলার অতি উর্বর তিন ফসলী ৭৫হাজার ৮শত ৮০হেক্টর কৃষি জমির মধ্যে ২শত ৮৮হেক্টর জমি গড়ে ওঠা দেড় শতাধিক ইটভাটায় প্রত্যক্ষভাবে ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া এসব ইটভাটার দুষণ ও বিরূপ প্রভাবে চুতুর্দিকে আরও ৪গুণ জমি ফসলহানির শিকার হচ্ছে। এতো কিছু জানার পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি জমিতে কিভাবে ভাটা স্থাপনে ছাড়পত্র দেবে ? কৃষি বিভাগ থেকে কোন প্রকার ছাড়পত্র ছাড়াই কৃষি জমিতে দেদারসে ইটভাটা গড়ে উঠলেও আমাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় কিছুই করার নেই।’
তিনি দাবি করেন, ইটভাটা মালিকদের ‘সবাইকে ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ার সাথে কৃষি বিভাগ কোনভাবেই জড়িত নয়। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।

কোন প্রকার অনুমোদন ছাড়াই ইটভাটার মালিকরা ‘সবাইকে ম্যানেজ’ করে অতি উর্বর তিন ফসলি কৃষি জমিতে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নীতিমালা লংঘন করছে; দুদক সদর দপ্তরে প্রাপ্ত এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে সাথে নিয়ে পরিচালিত অভিযানে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন বলে জানালেন দুদক কুষ্টিয়ার সহকারী পরিচালক হাফিজুল ইসলাম।
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ ওবাইদুর রহমান জানান, জেলায় ভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাটা মালিকরা নীতিমালা লংঘন করেই এসব করছেন। তবে ব্যক্তিগত ভাবে কেউ ইচ্ছে করলেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে পারবেন না। কৃষি জমিকে অকৃষিজ দেখিয়ে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে এমন অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানালেন তিনি।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা