• রোববার   ১১ এপ্রিল ২০২১ ||

  • চৈত্র ২৮ ১৪২৭

  • || ২৮ শা'বান ১৪৪২

আজকের খুলনা

যে কাজ আপনাকে দারিদ্রের দিকে নিয়ে যায়

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহ তায়ালা সহজভাবে জীবনযাপনের কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের রাসূল (সা.) সেভাবেই চলেছেন এবং তার উম্মতদের সেভাবে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এরপরও আমরা অনেক ভুল করে থাকি। যা আমাদের জন্য নিয়ে আসে নানান বিপদ। কিছু কিছু কাজ বয়ে আনে দারিদ্রতা। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অপব্যয় ও অপচয়।  

ইসলাম অপব্যয় ও অপচয় নিষিদ্ধ করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে ঘোষণা করেছেন। অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে মানুষের জীবন থেকে বরকতও হ্রাস পায়। এর ফলে মানুষের ধন-সম্পদ ক্রমে হ্রাস পায়। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আহার করো ও পান করো; কিন্তু অপব্যয় করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমাদের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে খরচ করবে না। জেনে রেখো, যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই, আর শয়তান নিজ প্রতিপালকের ঘোর অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৬, ২৭)

উদাহরণত পানি আল্লাহর একটি বিশেষ নেয়ামত। আর আল্লাহ তাঁর নেয়ামতগুলো অপচয় করতে আমাদের নিষেধ করেছেন। আমাদের দেশ এবং বর্তমান পৃথিবীর গবেষকরা সুপেয় পানির ক্রমবর্ধমান অভাব এবং দূষিত পানির পরিমাণ বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কিত, অথচ এসবের মূলে রয়েছে দৈনন্দিন জীবনে পানি ব্যবহারে আমাদেরই অপচয় এবং উদাসীনতা। আধুনিক পৃথিবীতে পানির জন্য এ হাহাকার তো আমাদেরই কর্মফল।  

প্রিয়তম রাসূল (সা.) বিভিন্ন হাদিসে পানি পান করার আদব শিখিয়েছেন। এর প্রতিটিতে নিহিত রয়েছে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিধান। একটি হাদিসে রাসূল (সা.) পানির বড় পাত্র থেকে সরাসরি মুখ লাগিয়ে গড়গড় করে পান করা থেকে নিষেধ করেছেন, বরং ছোট পেয়ালায় ঢেলে তারপর দেখে পান করার জন্য আমাদের শিখিয়েছেন।

পানি ব্যবহারে আরো নির্দেশনা দিয়েছেন। এক হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা স্থির পানিতে পেশাব কোরো না, নাপাকি ফেলো না, কেননা তা তোমরা ব্যবহার করবে।’ (আবু দাউদ, হা. ৬৯, ৭০)

অপ্রয়োজনে পানি নষ্ট করা যেমন পানির অপচয়, তেমনি প্রয়োজন পূরণের সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি খরচ করাও পানির অপচয়। এমনকি সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে সরাসরি সাগর থেকে অজু করলেও বেশি পানি অজুতে খরচ করার অনুমতি ইসলাম দেয়নি।

হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, একবার রাসুলে কারিম সা. হযরত সাদ রা. এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় সাদ রা. অজু করছিলেন। তাঁর অজুতে পানি বেশি খরচ হচ্ছিল। রাসুল সা. তা দেখে বললেন, কেন এই অপচয়? সা’দ (রা.) আরজ করলেন, অজুতেও কি অপচয় হয়? রাসূল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, এমনকি বহমান নদীতে অজু করলেও। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হা. ৪২৫)

এমনকি একটি হাদিসে অজুর অঙ্গগুলো তিনবারের অধিক ধোয়াকে সীমা লঙ্ঘন আখ্যা দেয়া হয়েছে। (আল মু’জামুল কাবির, হা. ১১০৯১) অপচয় কেবল পানিতেই নয়, বরং সব কিছুতেই হারাম। বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাওয়াদাওয়া, কাপড়চোপড়—সব বস্তুতেই নিষিদ্ধ। বিদ্যুৎ, গ্যাসের অপব্যবহারও আমাদের একটি মারাত্মক ব্যাধি। আর খাদ্য অপচয় করা তো আমরা নিয়মিত ফ্যাশন বানিয়ে নিয়েছি। যেখানে দুমুঠো দানাপানির জন্য বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রাণ বিলীন করে দিচ্ছে, সেখানেই তাদের স্বজাতীয় শতকোটি মানুষ হাজার হাজার টন খাদ্য অপচয় করছে। যেখানে ইসলাম খাওয়ার উচ্ছিষ্টও সঠিক জায়গায় রাখার নির্দেশ দেয়, যাতে জীবজন্তু ও পশুপাখি তা খেতে পারে, সেখানে বিপুল পরিমাণে আমাদের ঘরে-বাইরে, হোটেলে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অপচয়ের উৎসব চলে।

খাদ্যের সঠিক ব্যবহারে রাসূল (সা.) অসংখ্য নির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিস শরিফে খাওয়ার পর বাসন ও আঙুল চেটে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (বুখারি, হা. ৫৪৫৬) হজরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল (সা.) যখন আহার করতেন, আহার শেষে তিনবার আঙুল চেটে খেতেন এবং বলতেন, তোমাদের খানার বাসন থেকে কিছু পড়ে গেলে উঠিয়ে পরিষ্কার করে খেয়ে নাও, তা শয়তানের জন্য ছেড়ে দিয়ো না। (আবু দাউদ, হা. ৩৮৪৫)

অপ্রয়োজনে পাখা ও বাতি ব্যবহার এবং একটির জায়গায় দুটি হওয়াও অপচয়ের শামিল। অপচয় বা অপব্যয় শুধু যে আর্থিক ক্ষতিই ডেকে আনে তা নয়; অপচয়ের কারণে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও দেশ ও সমাজের আরো অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে। অপচয় ছাড়া সব কাজে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের ব্যাপারে ইসলাম নির্দেশ প্রদান করেছে। অপচয় দারিদ্র্য আনে, আর দারিদ্র্য মানুষকে কুফরির দিকে ধাবিত করে। তাই অপচয় নয়, আবার কৃপণতাও নয়।

এ সম্পর্কে নবিজি  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা খাও, পান কর এবং দান কর, তবে তা অহংকার ও অপচয়ের মাধ্যমে নয়। কেননা আল্লাহ তায়ালা তার বান্দার ওপর তাঁর নেয়ামতের বহিঃপ্রকাশকে পছন্দ করেন। (মুসনাদে আহমাদ)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তুমি যা খেতে চাও খাও, যা পরিধান করতে চাও তা নেও, যতক্ষণ পর্যন্ত দুইটি বিষয় তোমাকে না পেয়ে বসে, (ক) অপচয় ও (খ) অহংকার।(তাফসীর ইবনে কাসীর)

যারা অপচয় এবং কৃপণতা করে না, তাদের আল্লাহ তায়ালা রহমানের বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের গুণাবলি বর্ণনা করেছেন। এদের গুণাবলির একটি হলো আল্লাহ পাকের বাণী, ‘এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না। আর কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা এই দুইয়ের মধ্যবর্তী।’ (সূরা আল ফুরকান : ৬৭)।

কাজেই আমাদের মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে চলতে হবে। সর্বদা অপচয় বর্জন করতে হবে। আর অপচয় বর্জন করাই প্রকৃত মুসলমানের কাজ। অপচয় কখনো মুসলমানের কাম্য নয়। অপচয় রোধ করে সমাজ জাতির কল্যাণে এগিয়ে এলে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সহজতর হবে।

অপচয়কারী কারও প্রিয় হতে পারে না। কেননা শয়তান মানবজাতির বন্ধু নয়, শত্রু। আর শত্রু কখনো প্রিয় হয় না। আর অপচয়কারী তো শয়তানেরই ভাই। তাই আমাদেরকে অপচয় থেকে সব সময় সাবধান থাকতে হবে।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা