• মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৭

  • || ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

আজকের খুলনা
২৬৬৭

বঙ্গবন্ধু যেভাবে মহানায়ক হয়ে উঠলেন

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ৯ জানুয়ারি ২০২০  

শুধু ঘোষণা দিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেনি। পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে তার বীজ বপন হয় ভাষা আন্দোলনে এবং প্রস্ফুটিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই এ জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঠেকাতে চেষ্টা চালিয়েছে। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গড়ে ওঠে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। তাই ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, তাকে ও তার দলকে শাস্তি পেতেই হবে। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি অবস্থায় ফাঁসির হুমকির জবাবেও বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগেও আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ।’ তিনি পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর কাছে কখনও মাথানত করেননি বলেই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ।


ছাত্রজীবনেই ভাষা আন্দোলন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসিকতা ও আপসহীনতার পরিচয় মেলে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে উচ্চশিক্ষার আশা পরিত্যাগ করতে হলেও তিনি বজায় রাখেন চারিত্রিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক আদর্শ। নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্বে আসা। ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রাদেশিক সরকারে তিনি কৃষি ও বনমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়। সে সময় শেখ মুজিব গ্রেফতার হন। মুক্তিলাভের পর ১৯৫৫ সালের ৫ জুন তিনি গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বলেন, “মাননীয় স্পিকার, আপনি দেখতেই পাচ্ছেন যে, ওরা ‘পূর্ববাংলা’ নামটা বদলিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ করতে চাচ্ছে। অথচ আমরা বারবার এই দাবিই করছি যে, এখন এর নাম শুধু বেঙ্গল (বাংলা) করা হোক। বেঙ্গল (বাংলা) শব্দের একটা ইতিহাস রয়েছে- এর নিজস্ব ঐতিহ্য বিদ্যমান। আপনারা নাম বদলাতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে জনসাধারণের মতামত নিতেই হবে। যদি আপনারা এই নাম বদলাতে চান, তাহলে আমাদের বাংলায় ফিরে গিয়ে জনগণকে জিজ্ঞেস করতে হবে তারা এ ধরনের পরিবর্তন মেনে নেবে কিনা?’’ বাঙালিদের কথা না ভেবে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ববঙ্গের নাম বদলে রাখে ‘পূর্ব পাকিস্তান’। এতে শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত মর্মাহত হন। তবে বাংলা ও বাঙালির প্রতি শেখ মুজিবের ভালোবাসা শতগুণে বেড়ে যায়।


শেখ মুজিব দলের স্বার্থে ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ক্ষমতা গ্রহণ তার কাছে খুব বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠেনি কখনও। তার ধ্যানজ্ঞান ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিব দলের সভাপতি হন। এ অধিবেশনেই তার ৬ দফা দাবিনামা সরকারের কাছে পেশ করার জন্য অনুমোদিত হয়। ৬ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা মুদ্রা প্রচলন, আলাদা বৈদেশিক বাণিজ্য ও আধা সামরিক বাহিনী গঠনের কথাও বলা হয়েছিল। ৬ দফা দাবির মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এতটাই ক্ষিপ্ত হন যে, ২০ মার্চ ঢাকায় কনভেনশনপন্থী মুসলিম লীগের সমাপ্তি অধিবেশনে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘প্রয়োজন হলে অস্ত্রের মুখে এর জবাব দেয়া হবে।’ কিন্তু শেখ মুজিব দমবার পাত্র নন, তিনি ২৩ মার্চ ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬ দফা কর্মসূচি’ পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেন। তিনি ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ান। ১৯৬৬ সালের ৮ মে তিনি গ্রেফতার হন। তারপর ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার দিনই আবারও জেলগেট থেকে তিনি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলায় গ্রেফতার হন। সরকার শেখ মুজিব ও তার কয়েকজন সহযোদ্ধার বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা করে। ১৯৬৯ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের ১১ দফা দাবি আদায় ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারসহ শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ অন্যান্য আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বাঙালিদের দাবি আদায়ে বহু আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান গণমানুষের নেতায় পরিণত হন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পর তিনি আরও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-জনতার সংবর্ধনা সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই উপাধি রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে তিনি গ্রহণ করেননি কিংবা এটা কারও দয়ার দানও নয়। এটা তার রাজনৈতিক জীবনের সাফল্যের স্বীকৃতি এবং তার প্রতি মানুষের ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক। সেদিনের গণসংবর্ধনার জবাবে বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলেছিলেন, ‘এই বলে মোর পরিচয় হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’ তার এই চাওয়া পূরণ হতে বেশি সময় লাগেনি। তিনি সত্যিই বাঙালির অতি আপনজনে পরিণত হন। তার মুখের কথায় বাংলার মানুষ উত্তাল তরঙ্গের মতো আন্দোলিত হতো। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলার নিঃশর্ত প্রত্যাহারের পর বঙ্গবন্ধু বীরের বেশে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ১৯৬৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের জন্য লাহোর যাত্রা করেন। গোলটেবিল বৈঠকে তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বিষয়ের সঠিক সমাধান চেয়ে প্রস্তাব পেশ করেন। তার দাবির প্রতি সরকার নমনীয় না হওয়ায় তিনি ১৩ মার্চ গোলটেবিল বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেন। ফলে গোলটেবিল বৈঠকের নামে সরকারের কূটকৌশল ব্যর্থ হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ ‘বাংলাদেশ’ করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘‘এক সময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। ...একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। ...জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধু ‘বাংলাদেশ’।’’ লৌহমানব বলে খ্যাত আইয়ুব খানের সামরিক শাসনাধীনে তার দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এমন বক্তব্য বাঙালির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।


১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তাস্তর করতে আইয়ুব খান বাধ্য হন। আওয়ামী লীগের আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকে। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন বলেই তিনি রাজনীতির মাঠে যথাসময়ে সঠিক কাজটি করতে পেরেছেন। নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে টালবাহানা শুরু করেন। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে ৬ দফা বাস্তবায়নের আড়ালে তার জীবনের লালিত স্বপ্ন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার দিকে অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকেন। তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রেসকোর্স ময়দানে এক বিরাট জনসভায় শপথ নেন। আরও শপথ নেন ৬ দফা বাস্তবায়নের। ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করেন। ৬ দফার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু কোনো আপস করেননি। ফলে সমঝোতা ছাড়াই ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান। তিনি ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দেন, ৩ মার্চ ঢাকায় গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসবে। পরে ১ মার্চ রেডিও-টেলিভিশনে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি সেই অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।


বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৩ মার্চে শুরু হওয়া অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনে দেশবাসী অভূতপূর্ব সাড়া দেয়। কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই দেশ চলতে থাকে। ৭ মার্চ অপরাহেœ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় এক বিরাট জনসভা। ঐতিহাসিক এই জনসভায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাকামী মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলে ঘোষণা দেন, ‘যার যা আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। ... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা সমন্বয় কমিটি আয়োজিত এক জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, ‘সরকার যদি ২৫ মার্চের মধ্যে আপসে পূর্ববাংলার স্বাধীনতা না দেয়, তাহলে ’৫২ সালের মতো মুজিবের সঙ্গে একযোগে বাংলার মুক্তি সংগ্রাম শুরু করব।’ তখন স্বাধীনতাই হয়ে ওঠে বাঙালির একমাত্র লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধু ২৩ মার্চ নিজ বাসভবনে বহু মানুষের উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ষড়যন্ত্রের নায়ক ইয়াহিয়া-ভুট্টোর নির্দেশে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। এই গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়ে উঠবে এবং দেশের স্বাধীনতায় বিশ্ব নেতাদের সমর্থন পাওয়া সহজ হবে ভেবেই বঙ্গবন্ধু কালবিলম্ব না করে সে রাতেই বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তাটি তৎকালীন ইপিআরের ওয়ারলেসযোগে চট্টগ্রামে প্রেরণ করেন। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান ২৬ মার্চ বেতারে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার ইংরেজি বার্তাটি রাত ১২টার পর চট্টগ্রামে পৌঁছে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তখন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর। সে কারণেই ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গভীর রাতে ধানমণ্ডির ৩২নং বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসে এবং পরে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে যদি আত্মগোপন করতেন তবে তিনি স্বাধীনতাকামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা না হয়ে হয়তো বিছিন্নতাবাদী নেতায় পরিণত হতেন। এক্ষেত্রেও তার বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় মেলে।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ‘হাইকমান্ড’ গঠন করেছিলেন। এই হাইকমান্ডের সব সদস্য নিয়ে ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তার অবর্তমানে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। কুষ্টিয়া জেলার তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় ১৭ এপ্রিল অসংখ্য স্বাধীনতাকামী মানুষ ও শতাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের উপস্থিতিতে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সরকার শপথগ্রহণ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ওড়ানো হয় জাতীয় পতাকা এবং বাজানো হয় জাতীয় সঙ্গীত। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করেন ‘মুজিবনগর’। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধুই যে বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা এবং তার নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে একথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার ভাষণে বলতে ভোলেননি। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি জনগণনন্দিত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ শেখ মুজিব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আজ বন্দি। তার নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জয় হবেই। জয় বাংলা।’
বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহিতা’, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ এবং অন্যান্য ‘অপরাধে’ পাকিস্তান সরকার বিশেষ সামরিক আদালতে গোপন বিচার শুরু করে।

একদিকে বিচারকার্য চলতে থাকে, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পক্ষে দিন দিন প্রবলতর হয়ে ওঠে বিশ্বজনমত। ফলে ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ‘চরম’ ব্যবস্থা গ্রহণে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েন। জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতা গ্রহণ করার পরপরই বিশ্বজনমতের চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির প্রতিটি পদক্ষেপই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ‘হাইকমান্ড’ গঠন, ৭ মার্চের ভাষণে জাতির প্রতি সঠিক দিকনির্দেশনা ও সময়মতো স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অদম্য সাহস আর অনমনীয় লক্ষ্যে পথ চলেই তিনি মাতৃভূমির স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয় অর্জন করেছেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা ও তার নামেই ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তার সমকক্ষ কোনো নেতা এ দেশে ছিল না। আওয়ামী লীগের নেতারা তো বটেই, স্বাধীনতার পক্ষের অন্য দলগুলোর নেতারাও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব মেনেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। কাজেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

এ কারণেই তিনি স্বাধীনতার মহানায়ক, বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির জনক।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর