• সোমবার   ০৩ আগস্ট ২০২০ ||

  • শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭

  • || ১৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

আজকের খুলনা
২০

পাটের আধুনিকায়নে চাকরি পাবেন শ্রমিকরা

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ৪ জুলাই ২০২০  

পাটকল শ্রমিকদের সব সংকট নিরসনের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের সব পাওনা একসঙ্গে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি পাটকলগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে বিশ্ববাজারের চাহিদার উপযোগী করে চালুর ক্ষেত্রে এই শ্রমিকদেরই নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। পাটকল শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধের লক্ষ্যে আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের তালিকা তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শ্রমিকদের পাওনার ক্ষেত্রে অর্ধেক ক্যাশে, অর্ধেক দেওয়া হবে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। ফলে তিন মাস পরপর মূলধন ঠিক রেখে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা তুলতে পারবেন শ্রমিকরা। শ্রমিকদের বাঁচানোর এ উদ্যোগ ও তৎপরতায় জন্য বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। এদিকে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই পাটকল শ্রমিকদের দায়িত্ব নিয়েছেন। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রত্যেককে ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার গণভবনে পাটকল নিয়ে এক বৈঠকে বলা হয়, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে শ্রমিকদের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার পাওনা পরিশোধ করবে সরকার। এতে বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো গত ৪৮ বছরের মধ্যে শুধু চার বছর লাভের মুখ দেখেছে এবং ৪৪ বছর ধরে অব্যাহতভাবে মোট ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। লোকসান হলে কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য সরকারের অর্থের ওপর নির্ভর করতে হতো বলে প্রতি মাসেই শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন নিয়ে সমস্যা চলছিল। পাটকল শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের লক্ষ্যে আগামী তিন দিনের মধ্যে তাদের তালিকা তৈরি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বলা হয়, এসব পাটকল বন্ধ থাকলে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় চালু থাকলে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ক্ষতি হয়। কাজেই এসব পাটকলের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তার জন্য সরকার তাদের ২০১৫ সালের জাতীয় মজুরি কাঠামো অনুযায়ী সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত পাট খাতের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নজর রয়েছে এবং তাঁর দর্শন হচ্ছে পাটকল শ্রমিকদের বাঁচানো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ইতোপূর্বে পাটের জন্মরহস্য উন্মোচনের জন্য গবেষণা খাতে অর্থায়ন করেছেন এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহারের ওপর বিশেষ নজর দেন। প্রধানমন্ত্রী পাটকল বন্ধের সাময়িক সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

 

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব শ্রমিক অনধিক ২ লাখ টাকা পাবেন তাদের পুরো টাকা এককালীন নগদ পরিশোধ করা হবে। ২ লাখ টাকার বেশি পাওনাদার শ্রমিকরা চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী গড়ে ১৩ লাখ ৮৬ হাজার এবং সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ টাকা পাবেন। পাওনা টাকার মধ্যে ৫০ শতাংশ এককালীন নগদ এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র আকারে পরিশোধ করা হবে। ১১ শতাংশ সুদে প্রত্যেক শ্রমিক প্রতি তিন মাসে সর্বনিম্ন ১৯ হাজার ৩২০ এবং সর্বোচ্চ ৭৪ হাজার ৫২০ টাকা পর্যন্ত পাবেন। এ ছাড়া অনেক আগে অবসরে যাওয়া ৮ হাজার ৯৫৬ জন পাটকল শ্রমিকের অবসর ভাতা পরিশোধ করতেও সরকারের ১ হাজার ২০ কোটি টাকা খরচ হবে। পাটকল শ্রমিকদের পাওনা টাকা সরাসরি তাদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে এবং কোনো পাটকল অথবা অন্য কোনো মধ্যস্বত্বভোগী এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকবে না। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবসরভোগীদের টাকা আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। কাউকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে না এবং পরে এ কারখানাগুলো চালু হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বৈঠকে বলা হয়, বর্তমানে দেশে যে পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হয় তার শতকরা ৯৫ শতাংশই বেসরকারি পাটকলে উৎপাদিত হয়। সরকারি খাতটি অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে গেছে; যা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছিল না। তাই সরকারি খাতের পাটকলগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে শ্রমিকদের সমুদয় পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলোকে আবার প্রতিযোগিতায় কীভাবে আনা যায় এবং কীভাবে শক্তিশালী করা যায় সে বিবেচনায় এখন পাটকলগুলো বন্ধের ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশনাও দিয়েছেন যে, পাটকলগুলো কীভাবে চালু করা যায় এবং সেগুলো যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে- এ-সংক্রান্ত একটি কর্মপন্থা তৈরি করে অতিদ্রুত তাঁর কাছে নিয়ে আসার জন্যও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন : এদিকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন, দেশের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আমাদের পাটকল শ্রমিক ভাইয়েরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই পাটকল শ্রমিকদের দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) পাটকল চালু হলে পুরনো শ্রমিকরা সেখানে অগ্রাধিকার পাবেন। গতকাল রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী লেনের বাসভবনে শ্রমিকদের শতভাগ পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার বিষয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান।

গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, পাট আমাদের অর্থকরী ফসল, এর উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন জড়িত। আমরা শ্রমিকের পুনর্বাসন চাই। পিপিপির আওতায় মিলগুলো আবার চালু হলে সেখানে পুরনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের জন্য ব্যাংক হিসাব নম্বর অবিলম্বে বিজেএমসিকে জানাতেও অনুরোধ জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব কে এম আবদুস সালাম এবং পাটকল শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী বলেন, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যখন কথা হলো, তখন তিনি বললেন, এই শ্রমিক ভাইয়েরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আন্দোলন করেছেন। ১ লাখ শ্রমিক যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। শ্রমিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মায়া আছে। শ্রমিক ভাইয়েরা সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা ভুলিনি। পাটমন্ত্রী বলেন, এটা সরকারি টাকা। মাঝখানে কেউ নেই। এখানে কোনো দালাল নেই। টাকা শ্রমিকদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি চলে যাবে। শ্রমিকরা কী পাচ্ছেন আর পাচ্ছেন না, তা আপনারা নিজেরাই জানতে পারবেন। শ্রমিকদের যা পাওনা রয়েছে, আমরা তার অর্ধেক নগদ ও অর্ধেক সঞ্চয়পত্র আকারে পরিশোধ করব। এতে তাদের সঞ্চয়ও হবে। সঞ্চয়পত্র থেকে তিন মাস পরপর মুনাফা পাবেন তারা। মন্ত্রী আরও বলেন, আজ এই শ্রমিকদের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে যেখানে এই শ্রমিকদের দায়িত্ব নিয়েছেন, সেখানে ভাবনার কিছু নেই। শ্রমিকরা ভালো থাকবেন, শান্তিতে থাকবেন, এটা আমার বিশ্বাস। শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। তবে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হতো পাটকলে। এসব কলের ৬০ বছরের পুরনো মেশিন দিয়ে উৎপাদন হতো না। পাটশিল্পের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে টেক্সটাইল লোকসানে ছিল, পিপিপির আওতায় দেওয়ার পর সেগুলো লাভে আছে। পাটকলগুলোও পিপিপি করা হচ্ছে সে আলোকে।

তিনি বলেন, আমরা পিপিপি করছি মানে মালিকানা চলে যাবে না। এখানে অংশীদারিত্ব থাকবে, বাইরের কোনো মালিকানা থাকবে না। আমরা ৬০ বছরের পুরনো মেশিনের স্থলে নতুন মেশিন বসাতে চাই, যার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে। সেখানে আমাদের পুরনো শ্রমিকরা অগ্রাধিকার পাবেন, যারা কাজ করতে চান। মন্ত্রী আরও বলেন, বাজেট থেকে বরাদ্দ শুরু হলেই শ্রমিকদের টাকা পরিশোধ শুরু হবে। আমরা চেষ্টা করব যত দ্রুত সময়ে অর্থ দেওয়া যায়।

তিনি বলেন, গত জুনের মজুরি আগামী সপ্তাহে দেওয়া হবে। নোটিস মেয়াদ অর্থাৎ জুলাই-আগস্টের ৬০ দিনের মজুরিও উভয় মাসে যথারীতি পরিশোধ করা হবে। সব ক্ষেত্রে মজুরি কমিশন, ২০১৫-এর ভিত্তিতে পাওনা হিসাব করা হবে। পিএফ, গ্রাচ্যুইটি, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সুবিধাসহ অবশিষ্ট সব পাওনার ৫০ শতাংশ স্ব স্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এবং বাকি ৫০ শতাংশ স্ব স্ব সঞ্চয়পত্র আকারে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। তিনি বলেন, ধরুন, যারা ১৪ লাখ টাকা পাবেন তাদের ৭ লাখ টাকা নগদ দেওয়া হবে। আর বাকি ৭ লাখ টাকার মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র থেকে তিন মাস পরপর ১৯ হাজার ৩২০ টাকা করে পাবেন। যাদের পাওনা ২৪ লাখ টাকা তারা তিন মাস পরপর সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৩ হাজার ১২০ টাকা, যাদের পাওনা ৩৮ লাখ টাকা তারা সঞ্চয়পত্র থেকে ৫২ হাজার ৪৪০ টাকা এবং যাদের পাওনা ৫৪ লাখ টাকা তারা তিন মাস অন্তর সঞ্চয়পত্র থেকে ৭৪ হাজার ৫২০ টাকা করে পাবেন। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেন, পাটকলগুলো পিপিপি প্রকল্পের আওতায় নতুন করে যাত্রা করবে। আমার দৃষ্টিতে শ্রমিকরা কর্মহীন হচ্ছেন না, ভালো জায়গায় যেতে হলে কিছু বেদনা থাকবে।

সরকার ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে ৮ হাজার ৯৫৪ জন পাটকল শ্রমিক অবসরে গেছেন তাদের প্রাপ্য সব বকেয়া, বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের (২৪ হাজার ৮৮৬ জন) প্রাপ্য বকেয়া মজুরি, শ্রমিকদের পিএফ জমা, গ্রাচ্যুইটি এবং সেইসঙ্গে গ্রাচ্যুইটির সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ হারে অবসায়ন সুবিধা একসঙ্গে আগামী সেপ্টেম্বরে শতভাগ পরিশোধ করবে। ২০১৫ সালের সর্বশেষ মজুরি কাঠামো অনুযায়ী প্রায় ২৫ হাজার পাটকল শ্রমিক অবসরকালীন সুবিধাসহ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাবেন। ধারাবাহিকভাবে লোকসানে থাকা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকলের ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী কর্মচারীর চাকরি গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসায়নের সিদ্ধান্ত হয় গত রবিবার।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর