• সোমবার   ৩০ মার্চ ২০২০ ||

  • চৈত্র ১৬ ১৪২৬

  • || ০৫ শা'বান ১৪৪১

আজকের খুলনা
সর্বশেষ:
রংপুরে ট্রেনের ইঞ্জিনের ধাক্কায় তিন নারীসহ নিহত ৪ কাল সব জেলায় ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হবেন প্রধানমন্ত্রী লন্ডন থেকে ফিরলেন ৬০ বাংলাদেশি দেশে করোনায় নতুন আক্রান্ত ১, সুস্থ ১৯ জন খুলনায় নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে নৌবাহিনীর ত্রান বিতরণ ঈদ পর্যন্ত বাড়তে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি দেশ এখন নিরাপদে আছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
১১

ঝিয়ের কাজ, লাঙ্গল চাষ করেও সফল ক্রীড়াবিদ সান্ত্বনা রায়

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২০  

সান্ত্বনা রানী রায়- লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার হরিদাস গ্রামের এই যুবতির কোন গুণটি দিয়ে লেখা শুরু করবো তা ভাবতে হলো বেশ কিছু সময়। ৩৭ বছরে পা দেবেন আগামী জুনে। ফেলে আসা ৩৬ বছরের তার সংগ্রামী জীবনের সর্বশেষ ঘটনা দিয়েই শুরু করা যাক।

ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৩ শ’ কিলোমিটার। রোববার ঢাকা থেকে তিনি মটরসাইকেল চালিয়ে চলে গেছেন নিজ গ্রামে! সকাল ১১ টায় রওয়ানা দিয়ে ঘরে পৌঁছান সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায়। পাক্কা সাড়ে ৮ ঘণ্টা।

সুবাস চন্দ্র রায় আর যমুনা রানী রায় দম্পতির চার সন্তানের বড় সান্ত্বনার এখন বড় পরিচয় তিনি আন্তর্জাতিক তায়কোয়নদোর একজন সফল খেলোয়াড়।

এই ডিসিপ্লিনের বিশ্বকাপেও খেলেছেন দুইবার। এর মধ্যে একবার ব্রোঞ্জ পদকও জিতেছেন। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ১০ টি স্বর্ণ, ২টি রৌপ্য এবং ২টি ব্রোঞ্জ পদক জেতা এই নারী ক্রীড়াবিদের জীবনের গল্পটা আলাদা। জীবন-সংগ্রাম কি সেটা হাড়েহাড়ে টের পেয়েই বড় হয়েছেন লালমনিরহাটের এই যুবতি। দিস্তা দিস্তা কাগজেও শেষ হবে না তার জীবনের পুরো কাহিনী লেখা।

সান্ত্বনাদের সংসারে দিন আনতে পান্তা ফুরায়। সুবাস চন্দ্র ও তার ভাইয়ের যৌথ পরিবার ছিল। দুই ভাইয়ের সব সন্তানেরই বড় সান্ত্বনা। অভাবের সংসারের বড় মেয়ে ছিল যেন অন্যদের বোঝা। সংসার থেকে তাড়াতে একটু বয়স হওয়ার পর থেকেই বিয়ে দেয়ার চেষ্টা। তার মা যমুনা রানী ছিলেন পুরো পরিবারের মধ্যে একটু শিক্ষিতা। মাধ্যমিক পাশ করা যমুনা রানী এক সময় ব্র্যাক-এ চাকরিও করতেন। তার বাধার কারণেই বাল্য বিয়েটা আটকেছিল সান্ত্বনার।

Santona

হরিদাস দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও পরে আদিতমারী কান্তেশ্বর বর্মন বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মাসে মাত্র ৬০০ টাকা বেতনে কিছুদিন গণশিক্ষায় চাকরি করেছিলেন সান্ত্বনা।

বয়স্ক নারীদের লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি নানা ধরনের হাতের কাজের প্রশিক্ষণও দিতে হতো তাকে। সংসারের ঘানি টানা, নানা বঞ্চনা- এ সবকিছু থেকে দুরে থাকতে একটু বাইরে (দুরের শহরে) পড়াশুনা করতে চাইলেন সান্ত্বনা। ২০০৫ সালে রংপুর সরকারী কলেজে ভর্তি হন অনার্সে (ইতিহাস)।

ওই সময়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসারে চাকরির চেষ্টাও করেছিলেন সান্ত্বনা; কিন্তু পারেননি তার বাবার বাধার কারণে। তার কিছু আত্মীয়-স্বজন সুবাস চন্দ্র রায়কে নিরুৎসাহী করেছেন মেয়েকে যেন সার্ভিসেস চাকরিতে না পাঠান। রংপুর শহরে থেকে পড়াশুনার করার সংগতি ছিল না বলে বাড়ি থেকেই কলেজে যাওয়া-আসা করতেন।

খেলাধুলায় বেশ পারদর্শী ছিলেন; কিন্তু পড়াশুনার পাশপাশি তাকে জমিতে কাজ করতে হতো টাকার জন্য। যে কারণে খেলাধুলা করাটা কঠিন ছিল তার পক্ষে। তবে সুযোগটা তার এসে যায় ওই বছরই। রংপুর স্টেডিয়ামে তখন মার্শাল আর্ট ট্রেনিং হতো। ভর্তি হলেন সেখানে। মায়ের কাছ থেকে আগে বিভিন্ন যোগ-ব্যায়াম শিখেছিলেন। মার্শাল আর্ট শিখতে কাজে লাগলো সে গুলো। অনার্স পাশ করে ২০০৮ সালে মাস্টার্সে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে।

Santona

২০১১ সালে প্রথম ঢাকায় অংশ নেন জাতীয় আইটিএফ তায়কোয়নদো চ্যাম্পিয়নশিপে। প্রথম অংশগ্রহণেই ব্ল্যাকবেল্টকে হারিয়ে চমক দেখান, প্রতিযোগিতায় পান রৌপ্য পদক।

সেই যে শুরু আর পেছনে তাকাননি। ২০১২ থেকে ২০১৭- পর্যন্ত পাঁচটি আসরে স্বর্ণ জিতে নিজেকে সেরা প্রমাণ করেন সান্ত্বনা। স্বাভাবিকভাবেই জায়গা পেয়ে যান বিশ্বকাপ দলে। ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশতম বিশ্ব তায়কোয়নদো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ফেরেন ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে।

২০১৮ থেকে এখন পর্যন্ত ৫টি ঘরোয়া প্রতিযোগিতা ও দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ৫টি স্বর্ণ এবং একটি করে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছেন সংগ্রামী এ নারী ক্রীড়াবিদ।

সান্ত্বনা যখন রংপুর সরকারী কলেজে অনার্সে অধ্যায়নরত, তখন নিজের পড়ার খরচ যোগাতে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজও করতে হয়েছে তাকে। ‘আমার কষ্টের এসব কাহিনী আমি গর্ব করেই বলবো। কারণ, সেটা ছিল আমার জীবন সংগ্রাম। অন্যের বাড়িতে থালা-বাসন ধুয়ে, রান্না-বান্না করে, টিউশনি করে, কোচিং সেন্টারগুলোয় পার্টটাইম ক্লাস নিয়ে আমি আয় করে নিজের পড়ার খরচ জুগিয়েছি। সপ্তাহের দিনগুলো ভাগভাগ করে এ কাজগুলো আমাকে করতে হয়েছে। যেমন কয়েকদিন ঝিয়ের কাজ, কয়েকদিন টিউশনি, কয়েকদিন কোচিং সেন্টারে পার্টটাইম ক্লাস। আমি জমিতে লাঙ্গল চালিয়েও পড়ার খরচ জোগাড় করেছি। কারণ, বাড়ি থেকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে পারতো না। বরং তাদেরকে কিছুকিছু আমাকেই দিতে হতো’-নিজের সংগ্রামী জীবন কাহিনী এভাবে বলছিলেন সান্ত্বনা রানী রায়।

Santona

বর্তমানে ২০ হাজার টাকা বেতনে চাকুরি করেন ক্যাম্ব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজে। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে গিয়ে মার্শাল আর্ট তায়কোয়নদো শেখাতে হয়। নিজের মটরবাইক চালিযে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন। বাইকের তেলের টাকাও নিজের পারিশ্রমিক থেকে খরচ করতে হয়। যে কারণে, ২০ হাজার টাকায় নিজের চলার পর তেমন কিছু দিতে পারেন না বাড়িতে। ৮০ হাজার টাকা দিয়ে কিস্তিতে মটরসাইকেলটি কিনেছিলেন। এখন কিস্তি পরিশোধ হয়েছে পুরোপুরি।

মেজো বোন ববিতা রানী রায়কে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ভাই রতন কুমার রায় পদার্থ বিজ্ঞানে অর্নাস পাস করার পর এখন মানসিক রোগি। ভাইয়ের চিকিৎসা আর ছোট বোনের পড়ার খরচ জোগাতেই এখন হিমশিম খাচ্ছেন সান্ত্বনা রানী।

বোনের বিয়ে দিলেও নিজের বিয়ের খবর নেই। এ পর্যন্ত ৪-৫ টি বিয়ে প্রস্তাব আসলেও হয়নি। কেউ যৌতুক চায়, কারো আবার মেয়ের বাড়ি-ঘর পছন্দ হয় না। ‘বিসিএস ক্যাডারের এক ছেলে দেখেছিলেন। ১০ লাখ টাকা যৌতুক চান, এক এসআই দেখেছিলেন। তিনি চান ১৫ লাখ টাকা যৌতুক; কিন্তু আমার বাবা এত টাকা পাবেন কোথায়? জমিজমা যা ছিল বিক্রি আর বন্ধক দেয়ার পর আছে অল্প। সেখানে বাবা তামাকের চাষ করেছেন। তামাক উঠলে আবার ধান লাগাবেন। আমার বাবার বা আমার পক্ষে কি ১০-১৫ লাখ টাকা যৌতুক দেয়া সম্ভব?-প্রশ্ন সান্ত্বনার।

Santona

নারী হয়ে এভাবে মটরসাইকেল চালান কিভাবে? ঢাকা থেকে লালমনিরহাট চলে যান, আবার আসেন। এটা তো রীতিমত দুঃসাহসিক ব্যাপার। ‘আমার কাছে কিছুই না। তাহলে শুনুন, গত বছর আমার দাদু মারা যাওয়ার খবর পাওয়ার পর মটরসাইকেলে প্রথম ঢাকা থেকে লালমনিরহাট যাই। রাত আড়াইটায় আমি রওয়ানা দিয়েছিলাম। বাড়ি পৌঁছেছিলাম সকাল ১০টার দিকে। যাওয়ার সময় শুধু একজায়গায় ভয় পেয়েছিলাম। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা নামক এক জায়গায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছু মাতাল ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। মনে হয়েছিল যদি আমার মটরসাইকেলটা নিয়ে নেয়? তারপরও আমি চালিয়ে চলে এসেছি। মাঝে মধ্যে সুবিধামতো জায়গায় বিশ্রাম নিয়ে আবার মটরসাইকেল চালিয়েছি। এখন ঈদ ও পূজায় গাড়িতে যাত্রীর চাপ থাকলে আমি মটরসাইকেল নিয়েই লালমনিরহাট যাওয়া-আসা করি’-বলছিলেন সংগ্রামী ক্রীড়াবিদ সান্ত্বনা।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা
খেলা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর