• শুক্রবার   ০৫ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ২১ ১৪২৭

  • || ২২ রজব ১৪৪২

আজকের খুলনা

ওহি নাজিলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০২১  

কোরআনুল কারিম যেহেতু দুজাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর ওহির মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে, তাই ওহি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা  জরুরি। প্রতিটি মুসলমানই এ কথা জানে যে, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পরীক্ষার জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তার উপর বিশেষ কিছু দায়িত্ব অর্পণ করে গোটা বিশ্বকে তার সেবায় নিয়োজিত করেছেন। তাই দুনিয়ায় আগমনের পর মানুষের জন্য দু’টি কাজ অবধারিত।

প্রথমত: তার চারপাশে এ বিশ্বের যা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। দ্বিতীয়ত: এ বিশ্বের সৃষ্টরাজিকে ব্যবহার করতে গিয়ে মহান আল্লাহর বিধিনিষেধকে সামনে রাখা। এমন কোনো কাজ না করা, যা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির পরিপন্থী হয়। 

আর উপরোক্ত দুটি দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য মানুষের জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক। কারণ,  বিশ্ব জগতের বাস্তবতা উপলব্ধি করা এবং এ সকল সৃষ্টিরাজির কোনটির কি বৈশিষ্ট্য ও এগুলো দ্বারা উপকৃত হবার পদ্ধতি কি? যতক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যাপারে জ্ঞান লাভ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ পৃথিবীর কোনো বস্তুকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। অনুরূপভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এ কথা জানবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি কোন পথে? তিনি কোন কাজটিকে পছন্দ করেন আর কোনটিকে অপছন্দ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির পথে কাজ করা অসম্ভব।

মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে এমন তিনটি বস্তু দান করে দিয়েছেন, যেগুলোর মাধ্যমে সে উপরোক্ত বিষয়গুলোর জ্ঞান লাভ করতে পারে। প্রথমত: মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়শক্তি। অর্থাৎ চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা ও ত্বক। দ্বিতীয়ত: মেধা শক্তি ও বিবেক। তৃতীয়ত: ওহি।

অনেক বিষয়ের জ্ঞান মানুষ পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে অর্জন করে থাকে। আবার অনেক বিষয়ের জ্ঞান মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ করে থাকে। আর যে সকল বিষয়ের জ্ঞান এ মাধ্যম দুটি দ্বারা অর্জন করা যায় না, সেগুলাের জ্ঞান ওহির মাধ্যমে দান করা হয়।

জ্ঞান অর্জনের উপরোক্ত তিনটি মাধ্যমের ক্রমধারা কিছুটা এমন যে, প্রত্যেকটির একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা ও বিশেষ পরিধি রয়েছে। এ সীমা ও পরিধির বাইরে মাধ্যমগুলো নিস্ক্রিয়। যেমন, যেসব বস্তুর জ্ঞান মানুষ পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা অর্জন করে, নিছক মেধাশক্তি দ্বারা সেগুলোর জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ, এ মুহূর্তে আমার সামনে একজন লোক বসে আছে। আমার দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি যে, সে একজন মানুষ। আমার চোখই আমাকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তার রঙ ফর্সা, কপাল প্রশস্ত, চুলগুলো কালো, ঠোট দুটো হালকা এবং চেহারা সুন্দর। যদি এ বিষয়গুলোর জ্ঞান নিজের পঞ্চ ইন্দ্রিয়শক্তি বাদ দিয়ে শুধু মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ করার চেষ্টা করা হয়, যেমন চোখ দুটি বন্ধ করে ওই ব্যক্তির গায়ের রঙ, শারীরিক গঠন-প্রকৃতি ও গোটা দেহের কথা কল্পনা করা হয় তাহলে আদৌ সে এসব বিষয়ের জ্ঞান লাভ করতে পারবে না।

ঠিক অনুরূপভাবে যেসব বস্তুর জ্ঞান মেধাশক্তির মাধ্যমে লাভ হয়, সেগুলো নিছক পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। যেমন, আলোচিত ব্যক্তির ব্যাপারে আমার এ কথাও জানা আছে যে, তার কোনো না কোনো একজন মা অবশ্যই আছেন। সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও আমার জানা আছে যে, তার একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। যদিও এ মুহূর্তে আমার সামনে না আছে তার মা আর না দেখি আমি তার সৃষ্টিকর্তাকে। কিন্তু আমার বিবেক ও মেধাশক্তি আমাকে জানান দিচ্ছে যে, এ ব্যক্তি নিজে নিজেই সৃষ্টি হতে পারে না। আমি যদি এখানে আমার বিবেক ও মেধাশক্তিকে বাদ দিয়ে নিজের চোখ বা দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে তার মা ও তার সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে বেড়াই, তাহলে এ বস্তুর জ্ঞান অর্জন করা কখনো সম্ভব হবে না। কারণ তাকে সৃষ্টি করার দৃশ্য এ মুহূর্তে আমার চোখের সামনে আসা সম্ভবপর নয়।

মোটকথা, যে পর্যন্ত পঞ্চইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক রয়েছে, সে পর্যন্ত বিবেক ও মেধাশক্তি কোনো দিক-নির্দেশনা দিবে না। যেখানে গিয়ে পঞ্চ ইন্দ্রিয়শক্তি অক্ষম হয়ে পড়ে, সেখান থেকে বিবেক ও মেধাশক্তির কার্যক্রম আরম্ভ হয়। কিন্তু এই বিবেক ও মেধা শক্তির দিক-নির্দেশনাও নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নয়। বরং নির্দিষ্ট একটি সীমায় গিয়ে সে থেমে যায়। এমন অনেক বস্তু আছে, যেগুলোর জ্ঞান না পঞ্চইন্দ্রিয় শক্তির মাধ্যমে অর্জন করা যায় আর না বিবেক ও মেধাশক্তি দ্বারা। যেমন, আলোচিত ব্যক্তির ব্যাপারে বিবেক ও মেধাশক্তি তা বলে দিয়েছে যে, তার একজন স্রষ্টা রয়েছেন, কিন্তু ওই ব্যক্তিকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? তাকে সৃষ্টির পেছনে কী উদ্দেশ্য?

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে তার উপর কী কী দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে? তার কোন কাজ আল্লাহ তায়ালার পছন্দনীয় আর কোন কাজ অপছন্দনীয়? ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তি যৌথভাবে প্রচেষ্টা চালালেও এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না। মানুষকে এই প্রশ্নাবলীর জবাব দেয়ার জন্য মহান আল্লাহ যে পন্থা অবলম্বন করেছেন, তার নামই হলো ওহি বা প্রত্যাদেশ।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, ওহি হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের জ্ঞান অর্জনের সর্বোচ্চ মাধ্যম। তার জীবনের সাথে সম্পৃক্ত সেসব প্রশ্নাবলীর জবাব সরবরাহ করে থাকে, ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তির মাধ্যমে যে গুলোর সমাধান সম্ভব হয় না। তাই ওহির জ্ঞান অর্জন করা ছাড়া মানুষের কোনো উপায় নেই। উল্লিখিত ব্যাখ্যা দ্বারা এ কথাও পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, মানুষের দিক- নির্দেশনার জন্য কেবল ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তিই যথেষ্ট নয় বরং তার হেদায়াত ও দিক-নির্দেশনার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত ওহির জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য।

আর যেহেতু ওহির দিক-নির্দেশনার সূচনাই হয় সেখান থেকে, যেখানে বিবেক ও মেধাশক্তি অকার্যকর, কাজেই ওহির প্রত্যেকটি বিষয়ই বিবেক ও মেধাশক্তি দ্বারা উপলব্ধি করা যাবে এমনটি আবশ্যক নয়। যেভাবে কোনো বস্তুর রঙ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা বিবেক ও মেধাশক্তির কাজ নয় বরং ইন্দ্রিয় শক্তিই তার জন্য যথেষ্ট। তদ্রুপ দীনি আকিদাগত অনেক বিষয় রয়েছে, যে গুলোর জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি শুধুমাত্র ওহির উপরই নির্ভর করে। কাজেই সেগুলো উপলব্ধি করার জন্য শুধু বিবেক ও মেধাশক্তির উপর নির্ভর করা ঠিক নয়। সারকথা হলো, ওহি এমন একটি মাধ্যম, যার দ্বারা মহান আল্লাহ তায়ালা তার নির্দেশাবলী নিজের কোনো বান্দা ও রাসূলগণের প্রতি প্রেরণ করেন এবং সেই মনোনীত রাসুলের মাধ্যমে সমগ্র জাতির নিকট পৌঁছিয়ে দেন। ওহির শিক্ষা হচ্ছে, এর মাধ্যমে বান্দাদেরকে ওইসব বিষয়ের শিক্ষা দেয়া হয়, যা তার নিছক নিজেদের ইন্দ্রিয়শক্তি ও মেধাশক্তির মাধ্যমে অর্জন করতে সক্ষম হয় না।

সে বিষয়গুলো নিরেট যেমন ধর্মীয় বিধি-বিধান সংক্রান্ত হতে পারে, তেমনি হতে পারে পার্থিব প্রয়োজন সংক্রান্ত। নবী-রাসুলগণের ওহি সাধারণত প্রথম প্রকারের হয়ে থাকে। তবে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পার্থিব প্রয়োজনীয় বিষয়ও ওহির মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা