• সোমবার   ০৬ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২২ ১৪২৭

  • || ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪১

আজকের খুলনা
৯০

ইভিএম নিয়ে বিএনপি’র আপত্তি কেন!

আজকের খুলনা

প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০২০  

এখন বিশ্বব্যাপী নির্বাচনে ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ব্রিটেন, আমেরিকা, জার্মানি- উন্নত যত সব দেশ আছে সেখানে ইভিএম ব্যবস্থা তো চালু আছেই, এমনকি ভারতের মতো কম উন্নত দেশেও ইভিএম ব্যবস্থা চালু হয়েছে। উন্নত বিশ্বে নির্বাচনে কারচুপি হয় না। সুতরাং সেখানে নির্বাচনে ইভিএম হোক আর ব্যালট পেপারের হোক- কোনো ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিযোগ নেই।

এখন আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থায় ইভিএম চালু করার চেষ্টা চলছে। পক্ষে বিপক্ষে নানা তর্ক হচ্ছে। গত সাধারণ নির্বাচনে আংশিকভাবে ইভিএম ব্যবস্থা ছিল। এতে প্রধান দুই দলের মধ্যে বিএনপি ইভিএম সম্পর্কে ঘোর আপত্তি উপস্থাপন করেছে। তাদের অভিযোগ নির্বাচনে কারচুপির জন্য এ ব্যবস্থার আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।

নির্বাচনে যদি কারচুপি করার ইচ্ছা থাকে তাহলে তো ব্যালট ব্যবস্থাও করা যায়- সেটাতো আমাদের জানা আছে। নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ হওয়া বা ত্রুটিহীন হওয়া তো ইভিএম যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ওপর, সরকারের সদিচ্ছার ওপর আর সহযোগিতার হয় অংশগ্রহণকারীদের।

আমরা ছোটবেলা দেখেছি নির্বাচনে প্রতিটি প্রার্থীর বাক্স থাকতো আর বাক্সের গায়ে প্রার্থীর মার্কা আঁকা থাকতো। ভোটারকে পোলিং অফিসার ভোটের পেপার দিত। ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীর বাক্সে ভোট ফেলে দিত। সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে দেখছি একটা একটা প্রার্থীর বাক্স খোলা হতো আর তার ভোট গণনা হতো। এত বিলম্বিত ব্যবস্থা ছিল যে গভীর রাতেও ভোটের ফল গণনা শেষ হতো না। মাঝে মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বাক্স ছিনতাই হতো।

তারপর ভোটের পেপারে প্রার্থীর মার্কা ও নাম ছাপানোর ব্যবস্থা হলো। এবং মার্কায় সিল মারার ব্যবস্থা হলো। তবে ভোট ফেলার ব্যবস্থা হলো একই বাক্সে। ভোট প্রদান পর্ব শেষ হওয়ার পর ভোট মার্কা অনুসারে বাছাই করা হয়। গণনা করা হয় তারপর ফলাফল ঘোষণা করা হয়। সবই বিলম্বিত পদ্ধতি।

১৯৩৫ সাল থেকে ভারত শাসন আইন অনুসারে নিয়মিত নির্বাচন প্রথা চালু হয়। তখন উভয় বাংলার জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি। এখন শুধু বাংলাদেশের লোক সংখ্যা হচ্ছে ১৬-১৭ কোটি। সুতরাং প্রাচীন পদ্ধতিতে ভোট গণনা ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে দুনিয়ার সর্বত্র লোকসংখ্যার কারণে ইভিএম ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

মানুষ এখন গ্রহে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর আমরা মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম (আ.) এর জামানা ধরে বসে থাকব তা তো হয় না। এখন সময়ের গুরুত্ব খুবই বেশি। অনেকেই ভাবেন যে ভোটকেন্দ্রে যাবেন না, যদি সম্ভব হয় বাসায় বসে ইন্টারনেটে ভোট দেবেন। ভবিষ্যতে তাই হবে।

বাবা আদম মাটি কাটবেন আর মা হাওয়া চরকায় সুতা পাঁকাবেন- সেই পদ্ধতি যদি অনুসরণ করি শত শত কোটি মানুষ তো বস্ত্র পরিধান করতে পারত না। যে কারণে বস্ত্র কারখানার উদ্ভব হয়েছে। এখন দোকানে দোকানে বাটখারার মাপ পদ্ধতিও উঠে গেছে। এখন ডিজিটাল মেশিন আছে, যা চান এক মিনিটের মধ্যে মেপে দিয়ে দিচ্ছে। কাস্টমারের দুই মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার অবকাশ নেই। একটু দেরি হলে দোকানিকে কাস্টমারের বকা শুনতে হয়।

এ অবস্থায় আমি জানি না বিএনপির নেতা-নেত্রীরা কেন ইভিএমের বিরোধিতা করছেন। বিএনপি সব সময় প্রযুক্তির পেছনে চলা দল। এরা ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সালে বিনা পয়সায় বাংলাদেশকে সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত না করে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল। পরে ১৯৯৬ সালের মে মাসে ৩১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে বাংলাদেশকে সংযুক্ত করেছে। বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সব ইভিএম মেশিন সমুদ্রে ফেলে দিতে। এ কেমন কথা! যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে যুগ তাদের পরিত্যাগ করবে। অনেক গহীন বনে এখনো বহু উলঙ্গ মানুষ আছে। যুগ কি এখন তাদের তালাশ করার কোনো প্রয়োজন বোধ করে?

একবার কুমিল্লা পৌরসভা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিএনপি তাদের চিরাচরিত জেদাজেদি করল ইভিএম ব্যবহার করলে তারা কুমিল্লায় ভোট বর্জন করবে এবং একপর্যায়ে তারা ভোট বর্জন করেছিল। কিন্তু তাদের মেয়রপ্রার্থী ভোট বর্জন করেননি। তিনি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। যথাসময়ে নির্বাচন হলো আর ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেল বিএনপি’র বহিষ্কৃত প্রার্থী নির্বাচনে জিতেছেন।

কথায় কথায় বিরোধিতা করা বিএনপির বদঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রাসঙ্গিক না হলেও এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ করতে হয়। দুই মাসব্যাপী বেগম খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন এই কথা বলে বিএনপি’র আবাসিক নেতা রুহুল কবির রিজভী প্রতিদিন প্রেস ব্রিফিং করেন। কয়দিন আগে জামিন চেয়েছেন তারা। জামিন হয়নি। এখন তারা বলছেন, খালেদা জিয়ার দীর্ঘ দুই বছর জেল খাটা হয়ে গেছে। সুতরাং অবশিষ্ট সময় ইচ্ছা করলে সরকার ডিসমিস করে তাকে মুক্তি দিতে পারে।

উকিল সাহেবদের অনুরোধ করবো ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কথা স্মরণ করতে। সেদিন গ্রেনেড যদি ট্রাকের ওপর পড়তো তাহলে আওয়ামী লীগের সব নেতার মৃত্যু হতো। যেখানে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও ছিলেন। লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় এ দুর্ঘটনা থেকে শেখ হাসিনা বেঁচে ছিলেন সত্য; তবে তা নিচে পড়ে তাদের নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এ ঘটনার পরিকল্পনাকারী তারেক রহমান। সুতরাং আওয়ামী লীগের গায়ে তো পুরনো জেদ থাকবেই। তারাও তো মানুষ। বেগম খালেদা জিয়ার যদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় তবে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতেই পারেন। তারা তো তা করছেন না। চিকিৎসার সঙ্গে তো আপসহীনতা চলে না।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখতে পাচ্ছি বিএনপি প্রার্থীরা প্রচারণায় পিছিয়ে আছেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা যখন ঘরে ঘরে ভোট প্রার্থনা করছেন, প্রচার করছেন, তখন বিএনপি নামমাত্র প্রচার আর মিডিয়ায়ই আছে। ভোটারদের ঘরে ঘরে নেই। এই পরিস্থিতিতে যদি ইভিএম ভোটে তাদের প্রার্থী পরাজিত হন তাহলে দোষ ইভিএমের ওপরই দেবেন- এমন পরিকল্পনায়ই হয়তো আছেন বিএনপি নেতারা।

ইতিমধ্যে চট্টগ্রামে সংসদ উপনির্বাচন ইভিএমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, ২৫ শতাংশ ভোটারও ভোট দেননি। তার মানে ভোটকেন্দ্রে ভোটার নেওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপি ইভিএমের চিন্তা না করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার চিন্তা করলেই তাদের মঙ্গল।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

আজকের খুলনা
আজকের খুলনা
পাঠকের চিন্তা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর